Brilliant প্রেম তখন: প্রেম এখন পর্ব ৪ & ৫

পর্ব ৪: স্বপ্ন দেখা দু’জনে

প্রেম তখন প্রেম এখন পর্ব ৪ & ৫ ভালোবাসার কথা বলা হয়ে গেলে, যেন একটা অদৃশ্য বোঝা হালকা হয়ে যায়। রিধি আর অর্ণবের মধ্যকার সেই ভদ্র দূরত্ব এখন আর নেই।
তার জায়গায় এসেছে একধরনের চেনা, সহজ, নির্ভরতা।

কলেজ ক্যাম্পাসের সেই শেষ বর্ষটা তারা একসাথে কাটায়—দিনে দেখা, রাতে ফোনে কথা, কখনও একসাথে পড়া, কখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ক্যান্টিনের কড়া লেবু চা, সেই পুরনো রেক্টাঙ্গুলার বেঞ্চ, গঙ্গার পাড়ের সন্ধ্যাবেলা—সবই যেন একে অপরের প্রেমের ক্যানভাসে আঁকা রঙ।

একদিন গঙ্গার ধারে বসে, রিধি বলল—

— “তুই কোন জায়গায় নিজের বাড়ি বানাতে চাস?”
অর্ণব একটু ভেবে বলল,
— “যেখান থেকে রোজ গঙ্গা দেখা যাবে।”
— “তার মানে, তুই আমাকে রোজ গঙ্গার ধারে নিয়ে যাবি?”
— “না, আমি তোকে এমন জায়গাতেই রাখব, যেখানে গঙ্গা নিজে আসবে তোকে দেখতে।”

রিধি হেসে ফেলল।
সে জানে, অর্ণব খুব রোমান্টিক নয়, কিন্তু তার শব্দগুলো ঠিক জায়গা মতো পড়ে।
সে চুপচাপ অর্ণবের কাঁধে মাথা রাখল।
প্রথমবারের মতো।
শরীরের নয়, মনে একটা আত্মিক স্পর্শ হলো।

📅 সময় গড়ায়…

কলেজ শেষ হয়ে আসে।
দু’জনেই ক্যারিয়ারের প্রস্তুতিতে মন দেয়।
অর্ণব কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ ডিপ্লোমা নেয়, রিধি NET-এর প্রস্তুতি নেয়।
সারাদিন ব্যস্ততা, রাতের দিকে ভিডিও কল, হোয়াটসঅ্যাপে কবিতার লাইন—”আজও যদি তুমি আমার পাশে বসো, তাহলে সন্ধ্যাটা আর কাঁদবে না…”

একদিন ফোনে কথা বলতে বলতে রিধি বলল—

— “তুই কি ভেবেছিস, ভবিষ্যতে আমরা কীভাবে থাকব? আমি মানে, আমরা—আমাদের সংসার, কাজ, পরিবার সব?”

অর্ণব একটু চুপ করে বলল—

— “ভেবেছি। আমি চাই আমাদের একটা ছোট্ট ২ কামরার ফ্ল্যাট থাকুক। একখানা রান্নাঘর, যেখানে তুই চা বানাবি আর আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গন্ধ শুঁকব। একটা বারান্দা, যেখানে তোর ফুলের টব থাকবে। আর একটা ছোট টেবিল, যেটাতে রাতে আমরা একসাথে বসে গল্প করব।”

রিধির চোখে জল এসে গেল। সে একটু নরম গলায় বলল—

— “তুই কি এমন ভাবতেই শিখেছিস? এত সুন্দরভাবে?”

অর্ণব হেসে বলল—
— “তোর জন্য শিখেছি। তুই না থাকলে এসব কল্পনাও করতাম না।”

🧭 সম্পর্কের বাস্তবতা

তাদের সম্পর্ক গভীর হলেও, তারা জানে যে বাস্তবতা খুব সহজ নয়।
তাই তারা দুজনেই পরিবারের কাছে নিজেদের সম্পর্কের কথা জানাতে চায়।
রিধি বলে—

— “তুই কি তোর মাকে বলতে পারবি?”
— “পারব। কিন্তু সময় দে। মা একটু রক্ষণশীল। তবে তোর ছবি দেখলে, তোর কথা শুনলে বুঝবে।”

— “আর তুই? তোর বাবা-মা তো আমাকে খুব পছন্দ করে না, তাই না?”
— “না না, সেরকম না। ওরা শুধু একটু চিন্তিত। তবে আমি বুঝিয়ে বলব, আমরা একে অপরকে কেমন বুঝি।”

এভাবেই তারা তৈরি হতে থাকে জীবনের পরবর্তী ধাপে পা রাখার জন্য—প্রেম থেকে বাস্তবতার দিকে, স্বপ্ন থেকে সিদ্ধান্তের পথে।

একদিন সন্ধ্যায় অর্ণব বলে—

— “তুই কি জানিস, প্রতিদিন যখন ফোন রাখার পর আমি তোর গলা কানে বাজতে শুনি?”
— “আচ্ছা? সত্যি?”
— “হ্যাঁ। তোর গলা আমার ঘুমের গান হয়ে গেছে।”

রিধি কিছু বলে না, শুধু হাসে।
ভালোবাসা অনেক কথা দিয়ে তৈরি হয় না।
কিছু নিরবতা, কিছু বোঝাপড়া, কিছু না বলা শব্দই গড়ে তোলে সত্যিকার প্রেম।

✒️ পর্ব ৫: প্রথম প্রতিবন্ধকতা

কলেজের দিন শেষ।

দুজনের নতুন জীবন শুরু—ক্যারিয়ারের, পরিবারে দায়িত্বের, আর নিজেদের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলার যাত্রা।

এক বিকেলে রিমি বসে আছে তার বালিশের গায়ে হেলান দিয়ে।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে “অর্ণব কলিং…”

— “হ্যালো! কি রে, এত তাড়াতাড়ি ফোন?”
— “রিধি , আজ আমি মাকে সব বলেছি।”
— “সত্যি? কী বলল তোমার মা?”
— “খুব চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘মেয়েটি কোন জাতের?’”
— “তার মানে… ওটা–ই প্রথম প্রশ্ন?”
— “হ্যাঁ… তারপর বলল, ওরা আমাদের মতো পরিবারে মানাবে কি না, তোর চাকরি আছে তো?”
— “তুই কী বললি?”
— “আমি বললাম, তুই আমার চেয়ে অনেক পরিণত, দায়িত্ববান, আর সবথেকে বড় কথা—তুই আমার সুখ।”

রিধি চুপচাপ শুনছিল।
তার বুকের মধ্যে যেন কেমন একটা ঝড় বইছিল।
— “অর্ণব, তুই তো জানিস, আমার বাড়ির পরিবেশ, বাবা কেমন রক্ষণশীল…”
— “তোরাও জানাও। একবার শুরু করতে হবে। আমি আছি তো। ভয় কিসের?”

📆 কয়েকদিন পর…

রিধি এক সন্ধ্যায় বাবার কাছে গিয়ে বসে।

— “বাবা, একটা কথা বলব?”
— “হ্যাঁ রে মা, বল।”
— “আমি একজনকে ভালোবাসি। ও আমার ক্লাসমেট ছিল। নাম অর্ণব।”

বাবা প্রথমে কিছু বলল না। তারপর মুখ শক্ত করে বললেন—
— “এই বয়সেই এসব ভাবিস? চাকরি নেই, সংসারের জ্ঞান নেই, এসব আবেগ দিয়ে সংসার চলে না, মা।”

রিধি চুপ করে বসে রইল। চোখে জল, কিন্তু মুখে প্রতিবাদ নেই।

মা পাশে এসে ধীরে ধীরে বললেন,
— “অর্ণবকে একদিন ডেকে আন। আমরা কথা বলব।”

📍 প্রথম পরিচয়

পরের সপ্তাহে অর্ণব গেল রিমির বাড়ি। সাদা পাঞ্জাবি, গম্ভীর মুখ, চোখে আত্মবিশ্বাস।

বাবা প্রথমে খুবই খুঁটিনাটি প্রশ্ন করলেন—
— “চাকরি কোথায়?”
— “বেসরকারি সফটওয়্যার কোম্পানিতে।”
— “বেতন কেমন?”
— “প্রথমে একটু কম, তবে ৬ মাসের মধ্যে প্রোমোশন নিশ্চিত।”
— “বাড়ির অবস্থা কেমন? বাবা কি করেন?”
— “আমার বাবা স্কুল মাস্টার। রিটায়ার করেছেন।”

বাবা মাথা নাড়লেন। স্পষ্ট বোঝা গেল, তিনি খুশি নন।

কিন্তু মা একবার মুখ তুলে বললেন—
— “তুমি কি সত্যিই রিধিকে ভালোবাসো?”

অর্ণব একটু সময় নিয়ে বলল,
— “আমি রিধিকে এমনভাবে ভালোবাসি, যেভাবে কেউ তার নিজের ভবিষ্যৎকে ভালোবাসে।”

রিধির মায়ের চোখে পানি চলে এল।

তিনি বললেন,
— “তবে থাকো পাশে। সময় দাও। আমরা বুঝে নেব।”

📜 সম্পর্কের দিকে এক পা

এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবারের অভ্যন্তরে অস্বীকৃতি, সন্দেহ, আর প্রশ্নের মধ্যেও সম্পর্কটা একটু একটু করে স্থান করে নিতে লাগল।

একদিন রাতে ফোনে রিধি বলল—
— “আমি জানি সব সহজ হবে না, অর্ণব। কিন্তু তুই আছিস বলেই আমি সাহস পাচ্ছি।”
— “তুই জানিস? তুইই আমার সাহস। তুই না থাকলে আমি এই লড়াই একা পারতাম না।”

ভালোবাসা এবার কেবল আবেগ নয়,
এটা হয়ে উঠেছে দায়িত্ব, ধৈর্য আর প্রতিজ্ঞা।

পর্ব ৬-এ আমরা দেখতে পাব—পারিবারিক সম্মতি আদায়, বিয়ের সিদ্ধান্ত, এবং বিয়ের আগের দিনগুলোর উত্তেজনা, হাসি-কান্না ও নতুন জীবনের প্রস্তুতি।