প্রেম তখন, প্রেম এখন

প্রেম তখন, প্রেম এখন পর্ব ১: লাইব্রেরির সেই সকাল

প্রেম তখন, প্রেম এখন : রিধি ও অর্ণবের প্রেমকাহিনির ভেতর দিয়ে আমাদের সমাজ, সম্পর্কের পরিবর্তন, বাস্তবতা ও অনুভবের গভীরতাকে তুলে ধরবে। প্রতিটি পর্বে থাকবে নতুন আবেগ, নতুন মোড়, কিন্তু মূল সুর হবে—ভালোবাসা।

প্রেম তখন কলেজ স্ট্রিটের ধারে কলকাতার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সারির বেঞ্চে বসে রিধি তখন পুরোপুরি বইয়ে ডুবে আছে। রবীন্দ্রনাথের “চোখের বালি” পড়ছে, আর মাঝে মাঝে ঠোঁট নেড়ে কী যেন আওড়াচ্ছে। গায়ে হালকা সাদা সালোয়ার, চোখে কালো চশমা, কপালে ছোট্ট একটা টিপ। চারদিকে ছুটোছুটি, নোটসের গুঞ্জন, কেউ প্রজেক্ট, কেউ গবেষণাপত্র নিয়ে ব্যস্ত।

তবে রিধি তখন অন্য জগতে।

ততক্ষণে, গণিত বিভাগের এক নিরব, মিতভাষী ছাত্র অর্ণব লাইব্রেরিতে ঢুকেছে। চশমার ফ্রেমটা কপালের কাছ থেকে ঠিক করে সে খুঁজছিল তার প্রয়োজনীয় বই—Real Analysis।

দু’জন একে অপরকে চিনত না, তবুও সেদিন কিছু একটার সূত্রপাত ঘটে।

রিধির খাতা হঠাৎ হাত থেকে পড়ে যায়। একটা পাতলা ঠুসঠুসে নোটবুক ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। ঠিক তখনই অর্ণব পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
সে নিচু হয়ে নোটবুকটা তুলল, তাকিয়ে দেখল—চমৎকার হাতের লেখা। যেন ছাপার অক্ষর। মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

— “আপনার লেখা দেখে ভয় পাচ্ছি… চুরি হয়ে গেলে আপনি কাকে দোষ দেবেন?”

রিধি একবার তাকাল তার দিকে। হালকা শ্যামলা গায়ের রং, চোখে গাম্ভীর্য, মুখে চাপা হাসি। কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে রিধি বলল,

— “ধন্যবাদ। না… কেউ নিলে হয়তো আমিই খুশি হব! মন দিয়ে পড়বে অন্তত।”

অর্ণব নীরবে মাথা নেড়ে চলে গেল।

সেদিন তাদের কথা মাত্র ৩০ সেকেন্ড। তবু সেই ৩০ সেকেন্ডের কথাই রাতে বারবার মনে পড়ছিল রিধির।
হয়তো এটা কাকতাল, হয়তো শুরু।

পর্ব ২: বন্ধু হয়ে ওঠা


পরদিন লাইব্রেরির করিডোরে আবার দেখা। এবার রিধি আগে হাসল।

— “কাল অনেক সুন্দর কথা বলেছিলেন, মনে লেগে গেছে।”

অর্ণব একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

— “আমি আসলে খুব একটা কথা বলি না। হয়তো কাল হঠাৎ ভদ্রতা করতে গিয়েই…।”

রিধি মৃদু হেসে বলে, “ভদ্রতা নয়, বরং ছোট্ট চেনা।”

এইভাবেই আলাপ জমে উঠতে থাকে। লাইব্রেরির টেবিলে পাশাপাশি বসা, ক্যান্টিনে দেখা, নোটসের বদল, একদিন মেস থেকে ফোন করে ক্লাসের ডেট জেনে নেওয়া—এইভাবে দুজনের সম্পর্ক ধীরে ধীরে এগোয়।

তাদের সম্পর্ক ছিল কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার মতো নয়, এক ধরনের বোঝাপড়া, সম্মান আর নিঃশব্দ সান্নিধ্যের উপর দাঁড়িয়ে।

রিধি অনেক কথা বলত, হাসত, অর্ণব শুনত, মাথা নেড়েই অনুভব প্রকাশ করত।

একদিন হঠাৎ বিকেলে, রিধি বলল,
— “তুই কখনো প্রেমে পড়েছিস?”

অর্ণব একটু ভেবে বলল,
— “ভেবেছি… হয়তো পড়েছি, কিন্তু স্বীকার করিনি।”

রিধি জিজ্ঞেস করল,
— “কার সঙ্গে? এখনও যোগাযোগ আছে?”

অর্ণব একটু চুপ থেকে বলল,
— “সে এখন ঠিক আমার পাশেই বসে আছে।”

রিধি প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেনি। তারপর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল।

সে হেসে ফেলল।
তবে ভেতরে কোথাও একটা শব্দ উঠল—ধপধপ।

✒️ পর্ব ৩: স্বীকারোক্তি


বিকেলের হালকা আলোয় গোটা ক্যাম্পাসটা একটা সোনালি ঝিলিকে মোড়ানো। গাছের পাতাগুলো নড়ছে মৃদু হাওয়ায়, আর ছায়াগুলো মাটির ওপর নাচছে।
রিধি আর অর্ণব হাঁটছে রাস্তার ধারে, কলেজ ক্যাম্পাসের শেষ মাথায় গঙ্গার দিকে যাওয়ার রাস্তা। রিধির হাতে একটা বই—“Wuthering Heights”, মাঝে মাঝে পাতায় চোখ বুলিয়ে আবার অর্ণবের দিকে তাকাচ্ছে।

অর্ণব বেশ চুপচাপ, তবে মুখে চিন্তার ছাপ। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে।

— “শুনছিস?”
রিধি একবার ডাকল।

— “হ্যাঁ… হ্যাঁ শুনছি। তুই বলছিলিস, ক‌্যাথির চরিত্রটা অনেকটা তোর মতো, তাই না?”

— “হুম, মানে তার মধ্যে যে অনুভূতির গভীরতা আছে… ভালোবাসা না বলেও অনুভব করানো—এটাই আমার খুব আপন মনে হয়।”

অর্ণব মাথা নিচু করে হাঁটছিল। হঠাৎ সে থেমে গেল।
রিধিও থামল। চুপচাপ তাকিয়ে রইল ওর দিকে।

অর্ণব মুখ তুলল ধীরে ধীরে।

— “রিধি…”

— “হ্যাঁ?”

— “আমি জানি, তুই খুব চটপটে, প্রাণবন্ত, অনেক মানুষ তোকে পছন্দ করে। তুই সবাইকে আপন করে নিতে জানিস। কিন্তু তোর সামনে দাঁড়িয়ে আমি যেন… খালি হই।”

— “মানে?”

— “মানে, আমি তোকে দেখলে নিজের ভিতরের সব কণ্ঠস্বর থেমে যায়। আমি চুপচাপ থাকি কারণ তোর চোখের ভাষা অনেক কিছু বলে দেয়। তুই পাশে থাকলে বাক্যগুলো দরকার হয় না।”

রিধি ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে তার একদম সামনে এসে দাঁড়াল।

— “তুই কি কিছু বলতে চাস, অর্ণব?”

অর্ণব নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— “আমি তোকে ভালোবাসি, রিধি । অনেকদিন ধরে। বলার সাহস পাইনি, ভেবেছিলাম তুই হয়তো বুঝবি। তোর হাসি, তোর ছায়া, তোর নীরবতায় আমি প্রেমে পড়েছি।”

রিধির চোখ বড় বড় হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে মুখ ফিরিয়ে তাকাল গঙ্গার দিকে। একটা স্টিমার সোঁ সোঁ শব্দ করে পার হচ্ছে।

তারপর সে মুচকি হেসে বলল,

— “আমি তো ভাবছিলাম, তুই কোনোদিন বলবিই না। জানিস, কবে বুঝেছিলাম তুই আমাকে একটু আলাদা চোখে দেখিস?”

— “কবে?”

— “সেদিন, যখন আমার গলা ব্যথা ছিল আর আমি কথা বলছিলাম না, তুই ঘণ্টা দুয়েক শুধু আমার পাশে বসে ছিলি… একটাও কথা না বলে। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এই নিরবতাও একধরনের প্রেম।”

অর্ণব কিছু বলার আগেই, রিধি হাতটা এগিয়ে দিল।


— “তুই যদি সত্যিই ভালোবাসিস, তাহলে কথা দে—ভবিষ্যতে এই নিরবতা দিয়েই আমাকে আগলে রাখবি।”

অর্ণব ধীরে ধীরে তার হাত ধরল। ঠান্ডা আঙুলের ভেতর ছিল একটা শিউরে ওঠা উষ্ণতা।

ক্যাম্পাসের গেটে তখন সন্ধ্যার আলো পড়েছে। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছে, কিন্তু এবার পাশে পাশে নয়—হাত ধরে।

নতুন একটা পথ শুরু হয়েছে।
প্রেম এখন শুধু কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তবের পথচলা



পর্ব ৪,৫-তে আমরা দেখব—তাদের প্রেম কীভাবে আরও গভীর হয়, সমাজ ও পরিবারকে জানানো, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন গাঁথা শুরু।


প্রকৃত হোমস্টে, আসান নগর, নদীয়া জেলা

পুগোপনে তোমারে সখা কতো ভালোবাসি